শ্রীরাম লীলা ও ইহার সার – বাল কাণ্ড

শ্রী: শ্রীমতে শঠকোপায় নমঃ শ্রীমতে রামানুজায় নমঃ শ্রীমদ বরবরমুিনয়ে নমঃ

শ্রীরাম লীলা ও ইহার সার

ভগবান শ্রীরঙ্গনাথ, যিনি ‘পেরিয পেরুমাল’ নামেও পরিচিত, তিনি শ্রীরঙ্গমে শয়ন মুদ্রায়  আছেন। আর ভগবান শ্রীমন্নারায়ণ শ্রীবৈকুণ্ঠে অবস্থান করছেন, যেখানে অসীম আনন্দ রয়েছে এবং যাঁর সেবা নিত্যসূরী ও মুক্তাত্মারা করে থাকেন। যদিও তিনি সেখানে অত্যন্ত আনন্দে ছিলেন, তবুও এই সংসারে যেখানে কর্মবন্ধনে আবদ্ধ আত্মারা বসবাস করছে, তাদের  কথা চিন্তা করে তাঁর দিব্য হৃদয় দুঃখে ভরে উঠে। তিনি তাঁর দিব্য হৃদয়ে বিচার করলেন যে তাঁর আমাদের সাহায্য করা উচিত, আমাদের উদ্ধার করা উচিত এবং আনন্দ প্রদান করা উচিত। সংসারে প্রলয় সম্পন্ন হওয়ার পর, সবকিছু বিনষ্ট এবং সূক্ষ্ম হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় তিনি অগণিত ব্রহ্মাণ্ড রচনা করলেন এবং প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডের জন্য আমাদের মধ্য থেকে একটি করে উত্তম আত্মাকে নির্বাচন করে একজন করে ব্রহ্মা নিযুক্ত করলেন। এবং সেই প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে ব্রহ্মা ও প্রজাপতিদের মাধ্যমে দিব্য প্রাণী, মানুষ, পশুপাখি এবং স্থাবর বা অচল সংস্থাসমূহের সৃষ্টি করলেন। এই সমস্ত কিছু সৃষ্টি করার পর, এদের মধ্যে প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে তিনি স্বয়ং ক্ষীরাব্ধিতে  ‘ক্ষীরাব্ধি নাথ’ রূপে অবস্থান করেন এবং সকলের রক্ষা করেন। যখনই ব্রহ্মা থেকে শুরু (shuru: persian word) করে দেবতাদের কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, তখন তাঁরা ক্ষীরাব্ধির দ্বারে আসেন এবং ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে নিজেদের দুঃখ দূর করেন।

এইভাবে, একবার এই সংসারে অনেক মানুষকে রাবণ নামক রাক্ষস অত্যাচার করেছিল। সেই কারণে, ব্রহ্মা এবং অন্যান্য দেবতারা চঞ্চল সমুদ্রে ব্যাকুল জাহাজের মতো আশ্রয়ের খোঁজে ক্ষীরাব্ধিতে ভগবানের কাছে এলেন এবং ওনাকে  নিজেদের কষ্টের কথা জানালেন।

ভগবানও লঙ্কা ধ্বংস করার সংকল্প নিলেন, যা রাবণ সহ বহু রাক্ষসে পরিপূর্ণ ছিল। ভগবান তাঁর দিব্য হৃদয়ে লঙ্কা ধ্বংস করার এবং তার মাধ্যমে এই সংসারের মানুষের কল্যাণের প্রতিজ্ঞা করে, সৌভাগ্যবতী কৌশল্যা এবং চক্রবর্তী রাজা দশরথের পুত্র শ্রীরাম রূপে অবতার গ্রহণ করলেন। আমাদের সম্প্রদায়ে শ্রীরামকে ‘পেরুমাল’ নামে জানা যায়। সেই সময় ভগবানের সাথে ভরত, লক্ষ্মণ এবং শত্রুঘ্নও জন্মগ্রহণ করেছিলেন। 

বশিষ্ঠজি, যিনি কুলগুরু ছিলেন, তিনি চার সন্তানকে উপযুক্ত নাম প্রদান করলেন। হৃদয় হরণকারী সুন্দর রূপের কারণে – শ্রীরাম; কৈঙ্কর্ষের ধন (লক্ষ্মী) পূর্ণ রূপে ধারণ করার কারণে – লক্ষ্মণ; [বশিষ্ঠ] মুনি এটি জানতে পারার কারণে যে এঁর দ্বারা রাজ্যের ভার বহন করা হবে – ভরত; এবং ভগবানের প্রতি ভক্তিরূপ শত্রুকে জয় করার কারণে – শত্রুঘ্ন, যিনি ভরতের প্রতি নিরন্তর সমর্পিত থাকেন, যিনি আবার শ্রীরামের ভক্ত।

শ্রীরাম সমস্ত উত্তম গুণের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠছিলেন। তাঁরা চারজনেই উপনয়ন সংস্কার গ্রহণ করলেন এবং গুরুকুলে বাস (গুরুর অধীনে পারম্পরিক অধ্যয়ন) করে অস্ত্র চালনায় বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠলেন। একবার ঋষি বিশ্বামিত্র চক্রবর্তী রাজা দশরথের সাথে দেখা করতে এলেন। রাজা তাঁকে স্বাগত জানালেন এবং তাঁর অত্যন্ত সম্মান করলেন। বেদজ্ঞ ঋষি উল্লেখ করলেন যে তিনি একটি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করছেন এবং কিছু রাক্ষস সেই যজ্ঞটি ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে; তাই তিনি যজ্ঞের সুরক্ষার জন্য শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে পাঠানোর অনুরোধ করলেন। এ কথা শুনে রাজা দশরথ প্রথমে ভয়ে মূর্ছিত হয়ে গেলেন এবং পরে চেতনা ফিরে এলে জানালেন যে তাঁর সন্তানরা অত্যন্ত ছোট এবং তিনি তাদের ছাড়া থাকতে পারবেন না, তাই তিনি তাদের পাঠাতে পারবেন না। কিন্তু বিশ্বামিত্র শ্রীরামের মহিমা বুঝিয়ে এবং বশিষ্ঠের সমর্থনে দশরথকে এই প্রস্তাব স্বীকার করতে বাধ্য করলেন। 

শ্রীরাম এবং লক্ষ্মণ বিশ্বামিত্রকে অনুসরণ করলেন। বনে প্রবেশ করার পর তাঁদের সামনে তাড়কা নামী এক ক্রূর রাক্ষসী এল। ঋষির আজ্ঞানুসারে শ্রীরাম তার ওপর বাণ নিক্ষেপ করে তাকে বধ করলেন। এরপর তার পুত্র মারীচ ও সুবাহু যুদ্ধ করতে এল। তাদের মধ্যে সুবাহুকে শ্রীরাম হত্যা করলেন। আর মারীচকে শ্রীরাম নিজের বাণের আঘাতে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। তিনি আরও অনেক শক্তিশালী রাক্ষসকে হত্যা করলেন। তখন বিশ্বামিত্রের যজ্ঞ তাঁর সুরক্ষায় নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলো।

এরপর ঋষি তাঁদের মিথিলা দেশের দিকে নিয়ে এলেন। পথিমধ্যে ঋষি গৌতমের আশ্রমে, গৌতমের পবিত্র পত্নী অহল্যা তাঁর অভিশাপের কারণে পাথর হয়ে ছিলেন। যেমনই সেই পাথরে শ্রীরামের দিব্য চরণের স্পর্শ লাগল, অমনি সেই পাথর পুনরায় অহল্যায় পরিণত হলো এবং তিনি অভিশাপ থেকে মুক্তি পেলেন। তারপর ঋষি, শ্রীরাম এবং লক্ষ্মণ মিথিলায় পৌঁছলেন। মিথিলার রাজা জনক নিজের কন্যা সীতার জন্য এক যোগ্য বর খোঁজার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, যিনি শিবের ধনুকে জ্যা  পরাতে পারবেন, তাঁর সাথেই তাঁর কন্যার বিবাহ দেওয়া হবে। বহু রাজপুত্র চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তাঁরা ধনুকটি তুলতে পর্যন্ত পারেননি। এই ঘটনার কথা জানতে পেরে বিশ্বামিত্র শ্রীরাম এবং লক্ষ্মণকে সেই আসরে নিয়ে এলেন যেখানে এটি আয়োজন করা হচ্ছিল। ঋষি রাজা জনককে শ্রীরাম ও লক্ষ্মণের পরিচয় দিলেন এবং শ্রীরামকে ধনুকে জ্যা পরানোর আদেশ দিলেন। শ্রীরাম অত্যন্ত সহজে ধনুকটি তুললেন এবং তাতে জ্যা পরিয়ে দিলেন । রাজা জনক এবং মাতা সীতা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। অবিলম্বে বিবাহের তারিখ (taarikh: urdu word) নিশ্চিত করা হলো; সমস্ত মানুষ শ্রীঅযোধ্যা থেকে এলেন। শ্রীরাম সীতাজীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন, ভরত মাণ্ডবীর সাথে, লক্ষ্মণ ঊর্মিলার সাথে এবং শত্রুঘ্ন শ্রুতকীর্তির সাথে বিবাহ করলেন।

ঠিক সেই সময় ভগবান পরশুরাম সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি ভগবানের আবেশ অবতারও বটে। তিনি নিজের কুঠার অস্ত্র দিয়ে একুশ প্রজন্মের দুষ্ট রাজাদের হত্যা করেছিলেন। সেই শিবধনুকের পেছনে একটি কাহিনী রয়েছে যাতে ভগবান শ্রীরাম জ্যা পরিয়েছিলেন। প্রাচীনকালে বিশ্বকর্মা দুটি ধনুক তৈরি করেছিলেন। একটি যুদ্ধ নির্ধারিত হয়েছিল, যার ভিত্তিতে কে জয়ী হয়ে সর্বোচ্চ দেবতা হিসেবে (hisaabe) প্রমাণিত হবেন তা নির্ধারণ করার জন্য বিষ্ণু এবং শিবের মধ্যে একটি যুদ্ধের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিষ্ণু যা তুলেছিলেন তা বিষ্ণু-ধনুক হয়ে গেল এবং শিব যা তুলেছিলেন তা শিব-ধনুক হয়ে গেল। যেমনই বিষ্ণু হুঙ্কার দিলেন, শিবের ধনুকটি সামান্য খণ্ডিত হয়ে গেল। এটি দেখে সকলে ভগবান বিষ্ণুকে মহান দেবতা হিসেবে স্বীকার করে নিলেন, এটি মেনে নিয়ে যে তিনি সেই কাজের মাধ্যমেই যুদ্ধ জিতে গেছেন। সেই বিষ্ণু-ধনুক পরশুরামজির কাছে চলে যায় এবং শিবধনুক জনকের কাছে আসে। এই ঘটনার পর, সেখানে আসা ভগবান পরশুরাম শ্রীরামের প্রতি ক্রুদ্ধ হলেন এবং বললেন যে তিনি শ্রীরামকে হত্যা করবেন। এটি দেখে দশরথ তাঁর পুত্রকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পরশুরামের কাছে প্রার্থনা করলেন। কিন্তু পরশুরাম তখনও ক্রুদ্ধই ছিলেন। যখন শ্রীরাম জিজ্ঞাসা করলেন যে তিনি কীভাবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারেন, তখন পরশুরাম বললেন, “তুমি খণ্ডিত শিবধনুক ভেঙেছ। যদি তুমি আমার এই বিষ্ণু-ধনুকেও জ্যা পরাতে পারো, তবে আমি (তোমার শ্রেষ্ঠত্ব) স্বীকার করে নেব।” সেই সময় শ্রীরাম পরশুরামের তপস্যাসহ বিষ্ণু-ধনুকটি গ্রহণ করলেন। তিনি সেই ধনুকেও জ্যা পরালেন, পরশুরামের সমস্ত শক্তি সমাপ্ত করে দিলেন এবং তাঁকে পুনরায় তপস্যা করার জন্য পাঠিয়ে দিলেন।

এরপর সকলে অত্যন্ত আনন্দের সাথে শ্রীঅযোধ্যায় ফিরে এলেন।

সার :

• ভগবান নিজের দয়ায় এই জগৎ সৃষ্টি করেন। তিনি এই সংসারে বসবাসকারী আত্মাদের কল্যাণের জন্য মহান প্রয়াস করে চলেছেন।

• শ্রীরামাবতারের ঘটনাগুলিতে, ভগবান শ্রীরাম গুরুজনদের কথা/আদেশ পালন করার মূল গুণটি প্রদর্শন করেন। লক্ষ্মণ ‘শেষত্ব’ (ভগবানের প্রতি দাসত্ব) প্রদর্শন করেন, যিনি ভগবানের প্রতি অনন্য দাসত্ব ভাব রাখেন। ভরত ‘পারতন্ত্র্য’ (পরতন্ত্রতা) প্রদর্শন করেন, যিনি পূর্ণরূপে ভগবানের কথা/আদেশ পালন করেন। শত্রুঘ্ন ‘ভাগবত শেষত্বম’ প্রদর্শন করেন যার অর্থ হলো ভরত, যিনি ভগবানের ভক্ত, তাঁর প্রতি দাসত্ব বজায় রাখা। মাতা সীতা দেখান যে প্রত্যেক মানুষের ভগবানের জন্য কীভাবে অস্তিত্বে থাকা উচিত, যিনি পরমপুরুষ। হনুমান ভগবানের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করেন। বিভীষণজি দেখান যে কীভাবে ভগবানের শরণাগতি নিতে হয়। এইভাবে শ্রীরামায়ণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য দর্শানো হয়েছে। 

•অত্যন্ত দয়ালু ভগবান কর্তৃক তাড়কা, যে নারী হওয়া সত্ত্বেও নিহত হয়েছিল, এর মাধ্যমে এটি বোঝানো হয়েছে যে ভগবান কেবল হৃদয় দেখেন, শারীরিক রূপ নয়।

• অহল্যার অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া, ভগবানের দিব্য চরণের স্পর্শে যেকোনো প্রকার দুঃখ দূর হওয়ার একটি উদাহরণ।

• ভগবানের অবতারদের ‘মুখ্যাবতার’ এবং ‘আবেশাবতার’-এ শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। মুখ্যাবতারে, তিনি পরমপদে বিদ্যমান সমস্ত গুণের সাথে পূর্ণরূপে অবতীর্ণ হন। আবেশাবতারে, তিনি তাঁর শক্তি বা স্বরূপ কোনো জীবাত্মার ওপর অর্পণ করেন। যাঁরা মোক্ষ লাভ করতে চান, তাঁদের জন্য আবেশাবতার পূজনীয় নয়।

• ভগবান শ্রীরাম এবং ভগবান পরশুরামের সাক্ষাতে আমরা বুঝতে পারি যে, আবেশাবতার কখনো মুখ্যাবতারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না।

• শ্রীমন্নারায়ণ এবং শ্রীমহালক্ষ্মী উভয়েই সর্বদা একসঙ্গে থাকেন। কিন্তু লীলার একটি অংশ হিসেবে তাঁরা এই জগতে অবতীর্ণ হন, কিছু সময়ের জন্য আলাদা থাকেন এবং দিব্য বিবাহের মাধ্যমে পুনরায় এক হয়ে যান। তবুও তিনি সর্বদা তাঁর (ভগবানের) দিব্য বক্ষস্থলে বিরাজমান থাকেন।

অডিয়েন্ সপ্তর্ষি রামানুজ দাস

তথ্যসূত্র – https://granthams.koyil.org/2024/12/09/srirama-leela-bala-kandam-hindi/ , https://granthams.koyil.org/2024/11/04/srirama-leela-bala-kandam-english/

প্রমেয় – https://koyil.org
প্রামাণ্য – http://srivaishnavagranthams.wordpress.com
প্রমথা – https://acharyas.koyil.org
শ্রী বৈষ্ণব শিক্ষা/বাল-বালিকা পোর্টাল – https://pillai.koyil.org

Leave a Comment