শ্রী: শ্রীমতে শঠকোপায় নমঃ শ্রীমতে রামানুজায় নমঃ শ্রীমদ বরবরমুিনয়ে নমঃ
সবাই অযোধ্যায় পৌঁছালেন এবং সেখানে খুব আনন্দের সাথে বসবাস করতে লাগলেন। ভগবান শ্রীরাম এবং মাতা সীতা ১২ বছর পর্যন্ত আনন্দের সাথে একসাথে রইলেন।
একবার চক্রবর্তী রাজা দশরথ তাঁর পুত্র শ্রীরামকে রাজসিংহাসনে বসানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তিনি একটি বিশাল সভা ডাকলেন এবং জনগণের কাছে তাঁদের মতামত জানতে চাইলেন এবং সকলেই আনন্দ সহকারে নিজেদের সম্মতি প্রকাশ করলেন। রাজা বশিষ্ঠ মুনির সাথে পরামর্শ করার পর রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করলেন। নগরটিকে সুন্দরভাবে সাজানো হলো। শ্রীরাম প্রয়োজনীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন এবং পরের দিন সকালে রাজ্যাভিষেকের জন্য প্রস্তুত হলেন।
সেই সময় মন্থরা, যে কুঁজি এবং কৈকেয়ীর দাসী ছিল, কৈকেয়ীর মনে অস্থিরতা সৃষ্টি করল এবং তাকে দশরথের কাছে ২টি বর চাইতে বলল, অর্থাৎ ১) ভরতের রাজ্য পাওয়া উচিত এবং ২) শ্রীরামের বনবাসে যাওয়া উচিত। যদিও এই বর শুনে দশরথ ব্যাকুল হয়ে পড়েন এবং মূর্ছিত হয়ে যান, তবুও তিনি কৈকেয়ীকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সফল হতে পারেননি। তখন তিনি শ্রীরামকে ডাকলেন এবং তাকে আদেশ দিয়ে বললেন, “কুলক্কুমরা ! কাডুরৈযপ্ পো” (হে এই বংশের বংশধর! বনবাসে যাও)। এই কথা শুনে শ্রীরাম বিন্দুমাত্র দুঃখিত হলেন না এবং তিনি আনন্দের সাথে তাঁর আদেশ স্বীকার করে নিলেন।
তিনি এই বিশাল দেশ, মহান রাজ্য চাননি এবং তিনি তাঁর মাতাদের সেখানেই রেখে গেলেন এবং তাঁদের হাতি ও রথ ত্যাগ করলেন, কোনো অলঙ্কার পরিধান করলেন না, গাছের ছাল ও মৃগচর্মের বস্ত্র পরিহার করলেন এবং নিজের দিব্য সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন।
সেই সময় মাতা সীতা হঠকারিতা করলেন যে তিনিও শ্রীরামের সাথে বনে যাবেন। প্রথমে শ্রীরাম এতে সম্মত হননি। কিন্তু মাতা সীতা বললেন যে স্থানে শ্রীরাম বিদ্যমান আছেন সেটিই স্বর্গ এবং যেখানে তিনি নেই সেটিই নরক, এবং তিনি নিজের কথার উপর আরও গুরুত্ব দিলেন এবং আরও বললেন যে যদি তিনি (শ্রীরাম) সম্মত না হন, তবে মাতা সীতা তাঁর নিজের কথা মতো তাঁর দিব্য চরণে আত্মসমর্পণ করবেন। লক্ষ্মণজীও শ্রীরামের কাছে প্রার্থনা করলেন। শ্রীরাম প্রথমে তো বারণ করেছিলেন, কিন্তু পরে এতে সম্মত হয়ে গেলেন। এইভাবে ধনুর্ধারী শ্রীরাম, মাতা সীতা এবং তলোয়ার-ধনু ধারণকারী লক্ষ্মণ বনের উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করলেন।
সর্বপ্রথমে তাঁরা শ্রীঅযোধ্যার মন্ত্রী সুমন্ত্রের রথে চড়লেন এবং অনেক দূর পর্যন্ত যাত্রা করলেন এবং রাতে একটি স্থানে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থামলেন। শ্রীঅযোধ্যার অনেক অধিবাসী তাঁদের সাথে চলেছিলেন। সকালবেলা তাঁদের ঘুম থেকে ওঠার আগে ভগবান শ্রীরাম, মাতা সীতা এবং লক্ষ্মণসহ সুমন্ত্রের রথে করে এগিয়ে গেলেন এবং অযোধ্যাবাসীদের থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। তারপর তাঁরা তমসা নদীর তীরে পৌঁছালেন। তাঁরা নদী পার হলেন এবং হরিণ, হাতি ও ঘোড়া যুক্ত জঙ্গল দিয়ে যেতে যেতে বেদশ্রুতি নদীর তীরে পৌঁছলেন।তাঁরা সেই নদী পার করে গোমতী এবং স্যন্দিকা নামক নদী পার করলেন । তাঁরা শ্রীঅযোধ্যার সীমানা ছেড়ে গঙ্গা নদীর তীরে পৌঁছালেন। সেখানে নিষাদ রাজের নেতৃত্বে শিকারীরা তাঁদের সাহায্য করতে এগিয়ে এল। নিষাদ রাজ শ্রীরামের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। শ্রীরাম নিষাদ রাজকে আলিঙ্গন করলেন এবং তাঁকে নিজের ভাই রূপে গ্রহণ করলেন। নিষাদ রাজ কিছু খাদ্যসামগ্রী নিবেদন করেছিলেন যা শ্রীরাম গ্রহণ করেননি। সেই দিন ওনারা নিশাদ রাজের দায়িত্বে একরাত বিশ্রাম করে কাটিয়ে, ওনার সাহায্যে পরের দিন গঙ্গা নদী পার হলেন।তারপর তাঁরা ঋষি ভরদ্বাজের আশ্রমে পৌঁছালেন এবং তাঁর আশীর্বাদ লাভ করলেন এবং পরিশেষে চিত্রকূটের এক অত্যন্ত সুন্দর পাহাড়ি অঞ্চলে পৌঁছালেন। সুমন্ত্র তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন এবং শ্রীঅযোধ্যায় ফিরে গেলেন। তিনি শ্রীঅযোধ্যার অধিবাসীদের শ্রীরাম এবং অন্যান্যদের বিষয়ে অবগতি করালেন। তাঁদের কথা শুনে দশরথ অত্যন্ত দুঃখিত হলেন এবং নিজের শরীর ত্যাগ করে স্বর্গে চলে গেলেন। ভরত শ্রীঅযোধ্যায় পৌঁছালেন এবং তাঁকে এই সমস্ত ঘটনার কথা জানানো হলো। তিনি নিজের মাতা কৈকেয়ীর প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং তারপর তিনি তাঁর পিতার শেষকৃত্য সম্পন্ন করলেন। এরপর বশিষ্ঠ আদি ভরতকে রাজ্যাভিষেক করার প্রস্তাব দিলেন, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি পরামর্শ দিলেন যে সকল মানুষ চিত্রকূটে গিয়ে শ্রীরামের কাছে প্রত্যাবর্তনের প্রার্থনা করতে পারে। সবাই এই প্রস্তাবে সহমত দিলেন এবং ভরত উনার মাতাদের , বশিষ্ঠজী আদি ঋষিগন , শ্রীঅযোধ্যা নিবাসীগণ, সেনা, হাতি এবং ঘোড়ার সহিত চিত্রকূটের দিকে প্রস্থান করলেন।
এখানে জঙ্গলে লক্ষ্মণ একটি আশ্রম তৈরি করেছিলেন এবং তাঁরা তিনজন পাকা ও কাঁচা ফল খেয়ে এবং মাটিতে আরাম করে শুয়ে সরল জীবনযাপন করছিলেন। ভরত বিশাল সৈন্যসামন্ত নিয়ে সেখানে পৌঁছালেন এবং শ্রীরামকে অযোধ্যায় প্রত্যাগমন করার জন্য প্রার্থনা করলেন। কিন্তু শ্রীরাম তা করতে পুরোপুরি অস্বীকার করলেন এবং ভরতকে নিজের চরণ পাদুকা দিয়ে দিলেন। ভরত তা গ্রহণ করলেন, সবাইকে একত্রিত করলেন এবং শ্রীঅযোধ্যার বাইরের প্রান্তে পৌঁছালেন, সেখানে একটি আশ্রম তৈরি করলেন এবং সেখানে চরণ পাদুকা স্থাপন করলেন এবং তাঁর (পাদুকার) অধীনে রাজ্যের শাসনভার পরিচালনা করতে শুরু করলেন।
তৎপশ্চাৎ ভগবান শ্রীরাম, মাতা সীতা এবং অনুজ লক্ষ্মণের সাথে চিত্রকূট ছেড়ে দণ্ডকারণ্য-এ পৌঁছালেন।
সার:
- শ্রীরাম এর গুন এতটাই ভালো ছিল যে দশরথ দ্বারা নাগরিকদের কোনরূপ কষ্ট না দিয়ে সবথেকে ধর্ম পূর্ণরূপে রাজ্য চালনার পরেও তারা শ্রী রামের অতিরিক্ত অন্য কারও মহানতাকে বুঝতে পারেনি ।
- মন্থরা দ্বারা পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণে কৈকেয়ী পরব্রহ্ম শ্রীরামের প্রতি নিজের অগাধ প্রেম হারিয়ে ফেলেছিলেন। একইভাবে, আমরাও যদি জাগতিক বিষয়ে লিপ্ত থাকি তবে আমাদের দ্বারাও অপরাধ হতে পারে।
- যদিও দশরথ ধার্মিক ছিলেন, তবুও তিনি নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার জন্য সাধারণ ধর্ম পালন করেছিলেন, কিন্তু পরমপুরুষ শ্রীরামকে বনে না পাঠানোর বিশেষ ধর্মের কথা ভাবেননি। অতএব আমরা বুঝতে পারি যে তাঁরা কম বুদ্ধিমান ছিলেন।
- মাতা সীতা এবং লক্ষ্মণ উভয়েই এটি প্রদর্শন করেছেন যে আমাদের জন্য সত্যিকারের আনন্দ ভগবানের সাথে থাকা এবং সত্যিকারের দুঃখ তাঁর থেকে আলাদা হওয়া।
- নিষাদ রাজ গুহ-এর মধ্যে দোষ না দেখে বিনা দ্বিধায় তাঁর দ্বারা গুহ-কে গ্রহণ করার মাধ্যমে ভগবানের মহান গুণের পরিচয় পাওয়া যায়।
অডিয়েন্ সপ্তর্ষি রামানুজ দাস
তথ্যসূত্র – https://granthams.koyil.org/2024/12/16/srirama-leela-ayodhya-kandam-hindi/, https://granthams.koyil.org/2024/11/15/srirama-leela-ayodhya-kandam-english/
প্রমেয় – https://koyil.org
প্রামাণ্য – http://srivaishnavagranthams.wordpress.com
প্রমথা – https://acharyas.koyil.org
শ্রী বৈষ্ণব শিক্ষা/বাল-বালিকা পোর্টাল – https://pillai.koyil.org