শ্রী: শ্রীমতে শঠকোপায় নমঃ শ্রীমতে রামানুজায় নমঃ শ্রীমদ বরবরমুিনয়ে নমঃ
যখন শ্রীরাম অনুজ লক্ষ্মণের সহিত পম্পা সরোবরের তীরে পৌঁছালেন, তখন তাঁরা সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখলেন এবং দুঃখী হয়ে গেলেন, কারণ জননী সীতার বিচ্ছেদের কারণে এর আনন্দ উপভোগ করতে পারছিলেন না। তাঁরা অত্যন্ত শোক করলেন। সেই সময়ে, সুগ্রীব ঋষ্যমূক পর্বতে বাস করছিলেন, যেখানে তাঁর আগমন দেখে তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। সুগ্রীব তাঁর বড় ভাই বালির সঙ্গে শত্রুতার কারণে সেই পর্বতে লুকিয়ে বাস করছিলেন। তাঁর সঙ্গে জাম্ববান, হনুমান প্রভৃতিও ছিলেন। শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে দেখে সুগ্রীব ভীত হয়ে ভাবলেন যে হয়তো বালি তাঁদের পাঠিয়েছে। এটি দেখে হনুমান তাঁদের পরিচয় জানার জন্য তাঁদের কাছে গেলেন।
হনুমানজি একজন ব্রাহ্মণের বেশ ধারণ করে তাঁদের কাছে পৌঁছালেন। শ্রীরামকে নিকট থেকে দেখামাত্রই তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে গেলেন। তিনি অনুভব করলেন যে তিনি স্বয়ং ভগবানকে দর্শন করেছেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন যে সর্বদা ওনার সেবা করবেন। তিনি ভগবানের সঙ্গে পরিচয় স্থাপন করলেন এবং তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। লক্ষ্মণ ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে হনুমানজিকে জানালেন যে তাঁরা এখন সুগ্রীবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য এখানে এসেছেন। প্রফুল্লিত হয়ে হনুমানজি তাঁর মূল রূপ ধারণ করলেন, তাঁদের পূজা করলেন এবং তাঁদের সুগ্রীবের কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে হনুমানজি তাঁদের পরিচয় সুগ্রীবের সঙ্গে করিয়ে দিলেন , তিনি নিজের উদ্দেশ্য জানালেন এবং সুগ্রীবও আনন্দিত হলেন। অগ্নিকে সাক্ষী রেখে শ্রীরাম ও সুগ্রীব পরস্পরের বন্ধু হলেন এবং একে অপরকে সাহায্য করার প্রতিজ্ঞা করলেন। শ্রীরাম সুগ্রীবকে তাঁর ছোট ভাইরূপে গ্রহণ করলেন।
শ্রীরাম সুগ্রীবকে বললেন যে বালিকে পরাজিত করে রাজ্য সুগ্রীবকে সমর্পণ করবেন। সুগ্রীব তাঁর কথায় বিশ্বাস করতে পারলেন না। অতএব, শ্রীরাম তাঁর অনুজের সঙ্গে সাতটি বৃক্ষকে একটি মাত্র বাণে ভেদ করলেন। এরপর সুগ্রীব শ্রীরামের পরাক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে বালি ও সুগ্রীব একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন। এরপর সুগ্রীব বালিকে যুদ্ধের জন্য আহ্বান করলেন। উভয়ে পরস্পরের উপর আক্রমণ করতে লাগলেন। শ্রীরাম বালিকে বধ করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য একরূপ হওয়ার কারণে তিনি লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারলেন না। সুগ্রীব স্বস্থানে এলেন এবং আবার বালিকে যুদ্ধের জন্য আহ্বান করলেন। এবার সুগ্রীবকে সহজে চিনতে পারার জন্য তাঁকে একটি মালা পরিয়ে দেওয়া হলো। ভয়ংকর যুদ্ধ আরম্ভ হলো এবং সেই সময় শ্রীরাম একটি বৃক্ষের আড়ালে লুকিয়ে থেকে বালিকে বাণ দ্বারা বধ করলেন।
শ্রীরামের বাণ দেখে বালি প্রশ্ন করলেন যে শ্রীরামের এই কাজ কি সঠিক ছিল? রাম তাকে ধর্ম বুঝিয়ে সান্ত্বনা দিলেন এবং তাকে সদগতি প্রদান করলেন। এরপর শ্রী রাম সুগ্রীবের রাজ্যাভিষেক করলেন। এরপর ৮ মাসের জন্য চাতুর্মাস আসলো । সুগ্রীব প্রতিজ্ঞা করেছিল যে চাতুর্মাসের পরেই শ্রীরামকে সহায়তা করবে এবং শ্রীরাম ধৈর্য পূর্বক প্রতীক্ষা করছিলেন । কিন্তু সুগ্ৰীব সাংসারিক সুখের আনন্দ নিচ্ছিলেন এবং সাহায্য করার নিজের প্রতিজ্ঞা ভুলে গিয়েছিল । শ্রীরাম লক্ষ্মণকে পাঠালেন, যিনি সুগ্রীবকে উপদেশ দিলেন এবং তাঁরা জননী সীতার সন্ধান আরম্ভ করলেন।
সুগ্রীব বহু বানরকে চারদিকে পাঠালেন। সেই সময়, শ্রীরাম হনুমানকে তাঁর অঙ্গুরীয় দিলেন এবং সেটি সীতাজিকে দেখাতে বললেন। যারা পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিকে গিয়েছিল তারা কোনো সাফল্য ছাড়াই স্বস্থানে এল। হনুমান এবং অন্যান্য যারা দক্ষিণ দিকে গিয়েছিল, তাদের সাক্ষাৎ হলো সম্পাতির সঙ্গে, যিনি জটায়ুর বড় ভাই ছিলেন। তিনি তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তির দ্বারা লঙ্কায় জননী সীতাকে দেখতে পেলেন এবং তাঁদের এ বিষয়ে অবহিত করলেন।
হনুমান, যিনি অত্যন্ত বলশালী, নিজের মহান শক্তির দ্বারা সমুদ্র পার হয়ে লঙ্কায় পৌঁছালেন। তিনি জননী সীতার সন্ধান সর্বত্র করলেন এবং অবশেষে তাঁকে অশোকবাটিকায় অত্যন্ত করুণ অবস্থায় দেখতে পেলেন। জননী নিজের কেশ দিয়ে ফাঁসি লাগিয়ে প্রাণত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন। হনুমানজি তাঁকে শ্রীরামের মহিমা শুনিয়ে নিবৃত্ত করলেন এবং জানালেন যে তিনি শ্রীরামের দূত। এরপর তিনি তাঁকে শ্রীরামের অঙ্গুরীয় প্রদান করলেন, যা দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। হনুমান তাঁদের এবং শ্রীরামের মধ্যকার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে তাঁর বিশ্বাস অর্জন করলেন।
সার –
- নিজ অবতারের মধ্যেও ভগবান শ্রীমহালক্ষীর বিয়োগে থাকতে পারেন না। এই জন্য তিনি প্রত্যেকটা স্থানে তাকে না খুঁজে পেয়ে অনেক দুঃখী হয়েছিলেন।
- একজন প্রকৃত ভক্তের জন্য, যখন তিনি ভগবানকে দেখবেন, তখন তিনি অত্যন্ত আনন্দ প্রাপ্ত হবেন। সেই মুহূর্তেই, তিনি নিজেকে পূর্ণরূপে ভগবানের প্রতি সমর্পণ করে দেবেন। যেটা হনুমানজীর ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে।
- যদিও ভগবান নিজে মানব রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, কারণ তিনি নিজের ক্ষমতাকে মানব রূপে লুকিয়ে রেখেছিলেন, তবুও সুগ্রীব শ্রীরামের পরীক্ষা নিয়েছিলেন এবং তার পরেই তাঁকে মিত্র রূপে স্বীকার করেছিলেন। এটিই এই জগতের স্বভাব।
- বালী বধ একটি অত্যন্ত বিশ্লেষিত বিষয়। কিন্তু এমন হওয়া সত্ত্বেও শ্রীরাম নিজে বালীকে স্পষ্টীকরণ দিয়েছিলেন এবং তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কারণ বালী নিজের ভাইয়ের সাথে অন্যায় করেছিল এবং যেহেতু সে নিজের ভাইয়ের স্ত্রীকে কেড়ে নিয়েছিল, তাই তাকে দণ্ডিত করা হয়েছিল। কারণ বানর পশু , তাই তাকে পেছন থেকে মারাও কোনো অনুচিত বিষয় নয়।
- এমনকি যখন সুগ্রীব শ্রীরামের সাহায্য করতে ভুলে গিয়েছিলেন, তখনও শ্রীরাম লক্ষ্মণের মাধ্যমে তাকে সংশোধন করেছিলেন। নিজের ভক্তদের বিষয়ে, ভগবান তাদের সংশোধনের জন্য অনেক প্রচেষ্টা করে থাকেন।
- যেহেতু শ্রীরাম হনুমানজিকে আংটি দিয়েছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই এটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে হনুমানজিই মাতা সীতাকে খুঁজে বের করবেন।
- হনুমান নিজের মধুর বাণী দিয়ে বিনাশকারী সিদ্ধান্ত নিতে চলা মাতা সীতাকে বাঁচিয়েছিলেন এবং এইভাবে শ্রীরামকেও বাঁচিয়েছিলেন। এটি সর্বোত্তম কৈঙ্কর্য (সেবা)।
অডিয়েন্ সপ্তর্ষি রামানুজ দাস
তথ্যসূত্র – https://granthams.koyil.org/2024/12/18/srirama-leela-kishkindha-kandam-hindi/ , https://granthams.koyil.org/2024/11/23/srirama-leela-kishkindha-kandam-english/
প্রমেয় – https://koyil.org
প্রামাণ্য – http://srivaishnavagranthams.wordpress.com
প্রমথা – https://acharyas.koyil.org
শ্রী বৈষ্ণব শিক্ষা/বাল-বালিকা পোর্টাল – https://pillai.koyil.org