শ্রীরাম লীলা ও ইহার সার – আরণ্য কাণ্ড

শ্রী: শ্রীমতে শঠকোপায় নমঃ শ্রীমতে রামানুজায় নমঃ শ্রীমদ বরবরমুিনয়ে নমঃ

শ্রীরাম লীলা ও ইহার সার

<< অযোধ্যা কাণ্ড

দণ্ডকারণ্য পৌঁছানোর পর, সেখানে বসবাসকারী ঋষিগণ আগমন করলেন এবং শ্রীরাম, মাতা সীতা ও লক্ষ্মণজীর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। শ্রীরাম তাঁদের কষ্টের কথা শুনলেন এবং বুঝতে পারলেন যে রাক্ষসরা তাঁদের ওপর খুব অত্যাচার করেছে। তিনি তাঁদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। জঙ্গলে তাঁদের যাত্রার সময়ে, বিরাধ নামক এক রাক্ষস মাতা সীতাকে নিজের সাথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। শ্রীরাম তাকে বধ করেন এবং মাতাজীকে রক্ষা করেন। এরপরে তাঁরা শরভঙ্গ মুনির আশ্রমে গেলেন এবং তাঁর আশীর্বাদ লাভ করলেন। তিনি সেখানে সাধু-সন্তদের কষ্টের কথাও শুনলেন এবং তাঁদের সান্ত্বনা দিলেন। এরপর তাঁরা সুতীক্ষ্ণ মুনির আশ্রমে পৌঁছালেন এবং তাঁর থেকেও আশীর্বাদ লাভ করলেন।

এর পরবর্তী সময়ে তাঁরা অগস্ত্য মুনির সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাঁর থেকে একটি বিশিষ্ট ধনুষ লাভ করলেন এবং তাঁরই নির্দেশনার ভিত্তিতে পঞ্চবটীর দিকে প্রস্থান করলেন।

পথিমধ্যে তাঁদের জটায়ু মহারাজের সাথে সাক্ষাৎ হলো। জটায়ুজী শ্রীরামকে বললেন যে তিনি সাহায্য করতে চান, যিনি কি না তাঁর মিত্র দশরথের প্রিয় পুত্র। ভগবান শ্রীরামও জটায়ুজীকে সম্মান জানালেন এবং তাঁর আশীর্বাদ গ্রহণ করলেন।

পঞ্চবটী পৌঁছানোর পর, লক্ষ্মণ একটি আশ্রম নির্মাণ করলেন এবং তাঁরা সেখানে বসবাস করতে লাগলেন। তখনই সেখানে রাবণের বোন শূর্পণখা এসে পৌঁছাল। সে একজন রাক্ষসী ছিল কিন্তু শ্রীরামের সুন্দর দিব্য রূপের কারণে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল। সে তৎক্ষণাৎ তাঁকে লাভ করতে চাইল। সে তাঁর কাছে গেল এবং নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করল। কিন্তু শ্রীরাম এ কথা বলে তা অস্বীকার করলেন যে তিনি আগে থেকেই বিবাহিত। তিনি তাকে লক্ষ্মণের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন যিনি একা ছিলেন। সে লক্ষ্মণের কাছে গেল, কিন্তু তিনি বললেন যে সে প্রভু শ্রীরামের সেবক এবং তাকে স্বীকার করতে পারবে না । সে অত্যন্ত গভীর হয়ে উঠল এবং মাতা সীতাকে নিজের বাধা মনে করে তার উপর আক্রমণ করার প্রয়াস করল। এই সময়ে শ্রীরামের আদেশে লক্ষণ তরবারির সাহায্যে শূর্পণখার কান এবং নাক কেটে দিল। তারপর সে সেখান থেকে পালিয়ে খর এবং দূষণের কাছে গেল এবং তাদের এই ঘটনাক্রম জানাল। খর এবং দূষণ ১৪,০০০ রাক্ষসের সেনা নিয়ে শ্রীরামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এল এবং শ্রীরাম তাঁদের স্বয়ং বধ করলেন। শূর্পণখা তৎক্ষণাৎ লঙ্কা চলে গেল এবং তার বড় ভাই রাবণকে এই ঘটনা সম্পর্কে সূচনা করলো। এটা শোনার পরে তার পরামর্শ অনুসারে সে মাতা সীতাকে অপহরণ করার পরিকল্পনা বানালো। সে নিজের মামা মারীচকে এক রহস্যময় হরিণের রূপ ধারণ করতে এবং শ্রীরামের আশ্রমে আশেপাশে ঘোরার অনুরোধ জানালো। মারীচ প্রথমে তো মানা করে দিয়েছিল কিন্তু শেষে সে সহমতি জানালো এবং সেই রাস্তা দিয়ে চলে গেল। মাতা সীতা সেই রহস্যময় হরিণটিকে দেখে তা পাওয়ার জন্য খুব উৎসুক হয়ে উঠলেন এবং সেজন্য তিনি শ্রীরামের কাছে সেটিকে ধরার অনুরোধ করলেন।

লক্ষ্মণ এটি বুঝিয়ে বললেন যে এই হরিণটি সন্দেহজনক দেখাচ্ছে, শ্রীরামকে বাধা দিলেন; তবুও শ্রীরাম সেটির পিছু নেওয়া আরম্ভ করলেন। কিছু সময় পর তিনি হরিণটির ওপর বাণ চালিয়ে সেটিকে ফেলে দিলেন এবং সেই সময় মারীচ চিৎকার করে উঠল, “সীতা! লক্ষ্মণ!”। এটি শুনে সীতাজী লক্ষ্মণকে গিয়ে শ্রীরামের সাহায্য করার জন্য বললেন। কোনো বিকল্প না পেয়ে, লক্ষ্মণ শ্রীরামের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। সেই সময়, রাবণ একজন সন্ন্যাসীর বেশে এল এবং সীতাজীকে নিজের সাথে নিয়ে গেল। যখন সে তাঁদের আকাশ মার্গ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, মাতাজী সাহায্যের জন্য চিৎকার করলেন, তখন জটায়ু মহারাজ তাঁদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন এবং রাবণের সাথে যুদ্ধ করলেন। কিন্তু রাবণ তাঁর ডানা কেটে দিল এবং তাঁকে নিচে ফেলে দিল। আর সে মাতা সীতাকে লঙ্কার অশোক কাননে বন্দি করে রাখল।

এখানে, শ্রীরাম এবং লক্ষ্মণ একে অপরের সাথে দেখা করলেন এবং পরিস্থিতি বুঝতে পারলেন। সীতাজীর অনুপস্থিতির কথা জানতে পেরে নিজের আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করেছেন এবং সব জায়গায় তাঁকে খুঁজতে লাগলেন। শ্রীরাম অত্যন্ত দুঃখী হলেন। জটায়ু মহারাজের এই স্থিতি দেখে তিনি দুঃখী হলেন এবং জটায়ুকে মোক্ষ প্রদান করলেন এবং তাঁর অন্তিম সংস্কার করলেন।পথে, কবন্ধ শ্রীরাম এবং লক্ষ্মণকে বন্দি করে নিল। সে একটি অভিশাপে পীড়িত ছিল এবং শ্রীরাম তাকে সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি দিলেন। কবন্ধ তাঁদের সুগ্রীবের সাথে দেখা করার অনুরোধ করল।

পথে, শ্রীরাম মতঙ্গ মুনির আশ্রমে পৌঁছালেন এবং শবরিকে আশীর্বাদ প্রদান করলেন যিনি সেখানে তাঁর প্রতীক্ষা করছিলেন। তিনি সেই ফল খেলেন যা শবরি তাঁর জন্য বেছে রেখেছিলেন এবং ভগবান শ্রীরাম শবরিকে মোক্ষ প্রদান করলেন। যেমনটা শবরি পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাঁরা দুজনেই পম্পা সরোবরে পৌঁছালেন।

সার –

  • দণ্ডকারণ্যের ঋষিদের দেখে, শ্রীরাম লজ্জিত হলেন। তিনি বিলম্বে আসার জন্য তাঁদের কাছে ক্ষমা চাইলেন। মাতা সীতার প্রেরণার ভিত্তিতে রাক্ষসদের দ্রুত বিনষ্ট করার পর তিনি তাঁদের প্রসন্নতা এনে দিলেন।
  • শূর্পণখা শ্রীরামকে পাওয়ার ইচ্ছা রাখত। কিন্তু সে মাতা সীতাকে মেরে শ্রীরামকে লাভ করতে চেয়েছিল – এমন একটি ক্রূর মন তার ছিল। তাই সে নিজের কান এবং নাক হারিয়ে বসল।
  • শ্রীরাম একাই খর এবং দূষণসহ ১৪,০০০ রাক্ষসকে নাশ করলেন। মাতা সীতা অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন এবং যুদ্ধের সময় মেলা ক্ষতের দাগ দূর করার জন্য তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।
  • মারীচ আগে থেকেই শ্রীরামের প্রতি ভীত ছিল, তাকে একবার শ্রীরামের বাণ দ্বারা আহত হয়েছিল। তারপরও সে এটি বুঝতে পেরেছিল যে যদি সে রাবণের সাহায্য না করে তবে সে রাবণের দ্বারা মারা যাবে। তাই সে ভাবল যে শ্রীরামের বাণে মারা যাওয়াই সবচেয়ে ভালো এবং সে রহস্যময় হরিণের রূপ ধারণ করা স্বীকার করে নিল।
  • মাতা সীতা শ্রীরামকে হারিয়ে দিলেন, কারণ যখন শ্রীরাম তাঁর নিকট ছিলেন তখন তিনি হরিণের ইচ্ছা করেছিলেন। যদিও এটি কেবল তাঁর দ্বারা করা একটি লীলা ছিল, তবুও আমাদের এটি বোঝা উচিত যে যতক্ষণ ভগবান আছেন, আমাদের তাঁর অতিরিক্ত অন্য কোনো বস্তুর ইচ্ছা করা উচিত নয়। এইভাবে মাতা সীতা লক্ষণকেও অতি কঠোর শব্দ বলেছিলেন। এর পরিণাম ওনাকে ভুগতে হয়েছিল। যদিও এটা একটা লীলা ছিল, এটা ভাগবত অপচারের (ভাগবতদের প্রতি অপরাধ করা) ক্রুর প্রকৃতিকে প্রদর্শন করে।
  • এটা বলা অসঙ্গত যে রাবণ সীতাজীকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। যদি আমরা সূক্ষ্মভাবে দেখি, তাহলে সত্য এই যে মাতা সীতা দিব্য দেবীদের মুক্ত করার জন্য নিজের ইচ্ছাতেই লঙ্কায় বন্দিনী হয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে কেবলমাত্র যখন তিনি সেখানে যাবেন, তখন শ্রীরাম তাঁর অনুকরণে সেখানে এসে লঙ্কাকে ধ্বংস করবেন এবং তাঁদের মুক্ত করবেন।
  • যখন আমরা শ্রীরামকে মাতা সীতার বিরহে কষ্ট সহ্য করতে দেখি, তখন আমাদের এই জগতের নির্মম স্বভাবকে বুঝতে হবে। এমনকি যখন ভগবান এখানে অবতীর্ণ হন, তখনও তাঁকে কিছু কষ্ট সহ্য করতে হয়। অতএব ভগবান ও আচার্যের কৃপায় এখান থেকে মুক্ত হওয়া এবং শাশ্বত কৈঙ্কর্যতে (সেবা) প্রবেশ করাই সর্বোত্তম।
  • শবরীর ফল প্রদান সম্পর্কে কিছু লোক বলেন যে, ভগবানকে সর্বোত্তম ফল অর্পণ করার জন্য তিনি সেগুলি চেখে দেখেছিলেন। কারণ ভগবান ভক্তিভরে সম্পাদিত এমন কার্য গ্রহণ করেন, তাই এইভাবে ব্যাখ্যা করায় কোনো ত্রুটি নেই।

অডিয়েন্ সপ্তর্ষি রামানুজ দাস

তথ্যসূত্র – https://granthams.koyil.org/2024/12/17/srirama-leela-aranya-kandam-hindi/ , https://granthams.koyil.org/2024/11/19/srirama-leela-aranya-kandam-english/

প্রমেয় – https://koyil.org
প্রামাণ্য – http://srivaishnavagranthams.wordpress.com
প্রমথা – https://acharyas.koyil.org
শ্রী বৈষ্ণব শিক্ষা/বাল-বালিকা পোর্টাল – https://pillai.koyil.org

Leave a Comment