শ্রীরাম লীলা ও ইহার সার – সুন্দর কাণ্ড

শ্রী: শ্রীমতে শঠকোপায় নমঃ শ্রীমতে রামানুজায় নমঃ শ্রীমদ বরবরমুিনয়ে নমঃ

শ্রীরাম লীলা ও ইহার সার

<< কিষ্কিন্ধা কাণ্ড

অত্যন্ত শক্তিশালী হনুমানজি বিশাল মহাসাগর অতিক্রম করে অশোকবাটিকায় প্রবেশ করলেন, যা লঙ্কার অভ্যন্তরে অবস্থিত ছিল এবং বহু দুর্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। সেখানে তিনি মাতা সীতার কাছে পৌঁছালেন। তিনি বৈদেহী (পিরাট্টি)-র সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং শ্রীরামের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলেন ও তাঁকে শ্রীরামের অঙ্গুরীয় (আংটি) প্রদান করলেন। এগুলো সেই ঘটনাবলি, যা হনুমানজি সীতামাতাকে শুনিয়েছিলেন— 

  • একবার শ্রীঅযোধ্যায়, যখন সীতাজি ও শ্রীরাম পরম আনন্দে বাস করছিলেন, এক বিশেষ রাত্রিতে সীতাজি চামেলি ফুলের মালা দিয়ে শ্রীরামকে অলঙ্কৃত করেছিলেন।
  • যখন শ্রীরামের রাজ্যাভিষেকের ঘোষণা করা হয়, তখন কুব্জি মন্থরা কৈকেয়ীর মনকে বিভ্রান্ত করে দেয়। কৈকেয়ী দশরথের কাছে গিয়ে তাঁর নিকট দুইটি বর প্রার্থনা করেন—ভরতের রাজ্যাভিষেক এবং শ্রীরামের বনবাস। এর ফলে বিভ্রান্ত চক্রবর্তী রাজা শ্রীরামকে বললেন, “তুমি বনে চলে যাও”, এবং তাঁকে বিদায় দিলেন। এরপর শ্রীরাম সীতাজি ও লক্ষ্মণের সঙ্গে বনে গমন করলেন।
  • গঙ্গার তীরে, শিকারীদের রাজা নিষাদরাজ গুহ, ভগবান শ্রীরামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন।
  • যখন তাঁরা চিত্রকূটে অবস্থান করছিলেন, তখন ভরত সেখানে এসে শ্রীরামের শরণ গ্রহণ করেন এবং তাঁকে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করার অনুরোধ করেন। কিন্তু শ্রীরাম তা প্রত্যাখ্যান করে নিজের পাদুকা তাঁকে প্রদান করেন।
  • একবার রাক্ষস-স্বভাবসম্পন্ন এক কাক দেবী সীতার দিব্য বক্ষে চঞ্চু দ্বারা আঘাত করেছিল, যখন ভগবান শ্রীরাম তাঁর কোলে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ভগবান উঠে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং সেই কাকের বিরুদ্ধে ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। কাকটি সর্বত্র ঘুরে বেড়াল, কিন্তু শেষে শ্রীরামের চরণকমলে আশ্রয় নিল। সীতামাতার পুরুষকারে ( সুপারিশে) শ্রীরাম কেবল সেই কাকটির একটি চোখ নষ্ট করেই তাকে ক্ষমা করে দিলেন।
  • শূর্পণখার প্ররোচনায় রাবণ মারীচকে স্বর্ণমৃগের রূপে পাঠায়। তাকে দেখে সীতামাতা মোহিত হন এবং তাঁর প্রতি শ্রীরামের গভীর স্নেহের কারণে শ্রীরাম ধনুক হাতে সেই হরিণের পেছনে ধাবিত হন। পরে লক্ষ্মণও সেইখানে চলে যাই।

এইভাবে হনুমানজি শ্রীরামের বর্ণিত ঘটনাগুলি অম্মাজিকে (সীতাদেবীকে) বললেন এবং ভগবান শ্রীরামের আংটি তাঁকে প্রদান করলেন। দেবী সীতা, যাঁর অতি সুন্দর কেশ ছিল, আংটিটি দেখে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হলেন এবং পরম আনন্দের সঙ্গে তা নিজের মস্তকে ধারণ করলেন। এরপর হনুমানজির বর্ণিত ঘটনাগুলির সত্যতা তিনি স্বীকার করলেন। 

এরপর রাক্ষসরা পরাক্রমশালী হনুমানজির উপর আক্রমণ করতে এলো, কিন্তু হনুমানজি সহজেই তাদের ধ্বংস করে দিলেন। তিনি রাবণের পুত্র অক্ষয়কে বধ করলেন। তখন ইন্দ্রজিৎ হনুমানজিকে বন্দী করে রাবণের সভায় নিয়ে আসে। সেখানে হনুমানজি রাবণকে কিছু উত্তম উপদেশ দেন, কিন্তু রাবণ তা উপেক্ষা করে। পরে রাবণ রাক্ষসদের হনুমানজিকে হত্যা করার আদেশ দেয়। তারা হনুমানজির লেজে আগুন লাগিয়ে দেয়। সেই অগ্নির সাহায্যে হনুমানজি লঙ্কায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেন।

পরে তিনি পুনরায় অশোকবাটিকায় এসে সীতাদেবীকে বললেন যে তিনি এখন প্রত্যাবর্তন করবেন এবং তাঁকে শ্রীরামের সঙ্গে মিলিত করবেন। পিরাট্টি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন যে, যদি এক মাসের মধ্যে শ্রীরাম না আসেন, তবে তিনি নিজের প্রাণ ত্যাগ করবেন।

এরপর হনুমানজি সেখান থেকে ফিরে এলেন, সমুদ্র পার হয়ে সেই স্থানে পৌঁছালেন যেখানে বানরবাহিনী তাঁর প্রতীক্ষা করছিল। তিনি তাদের সমস্ত সংবাদ দিলেন। তারপর তাঁরা কিষ্কিন্ধ্যার দিকে রওনা হলেন। পথে তাঁরা সুগ্রীবের প্রিয় উদ্যান ‘মধুবন’-এ থামলেন, যেখানে তাঁরা কখনও কখনও বিশ্রাম নিতেন। সেখানে তাঁরা ফলভোগ করে আনন্দ লাভ করলেন। অবশেষে তাঁরা শ্রীরামের কাছে পৌঁছালেন এবং হনুমানজি সীতামাতার দর্শনের সংবাদ শুনিয়ে তাঁর প্রসন্নতা প্রকাশ করলেন। 

সার –

  • এই কাণ্ডকে ‘সুন্দরকাণ্ড’ বলা হয়, কারণ এটি সীতাজির মহিমাকে কেন্দ্র করে রচিত এবং একই সঙ্গে এটি হনুমানজির মহানতাকেও প্রকাশ করে। এখানে উভয়েই সুন্দর, এবং উভয়েরই মনোহর বাণী রয়েছে।
  • হনুমানজির অসাধারণ বাগ্মিতা ছিল। তিনি এমনভাবে কথা বলেছিলেন যাতে অম্মাজির দুঃখ দূর হয় এবং তিনি আত্মহত্যার চিন্তা থেকে বিরত থাকেন।
  • যে কাজ হাতে নেওয়া হয়, তাকে সর্বোত্তমভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে হনুমানজি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। যদিও অম্মাজির অবস্থান নির্ণয় করাই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য, তবুও তিনি লঙ্কার অনেক ক্ষতি সাধন করেন, রাবণের মনে ভয় সৃষ্টি করেন এবং এভাবে শ্রীরামের দিব্য ইচ্ছানুসারে কার্য সম্পন্ন করেন।
  • যখন হনুমানজি অম্মাজির কাছে প্রার্থনা করলেন যে তিনি তাঁকে শ্রীরামের নিকট নিয়ে যেতে পারেন, তখন অম্মাজি তাতে সম্মত হননি। তিনি এই বিষয়ে দৃঢ় ছিলেন যে একমাত্র শ্রীরামই লঙ্কাকে ধ্বংস করবেন এবং তাঁকে উদ্ধার করবেন।
  • সীতামাতার সন্ধান লাভ এবং তাঁর জীবন রক্ষার মাধ্যমে হনুমানজি দেবীকে রক্ষা করেছিলেন; আর এর দ্বারা তিনি শ্রীরামকেও রক্ষা করেছিলেন, কারণ শ্রীরামের অস্তিত্ব অম্মাজির অস্তিত্বের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। একইসঙ্গে তিনি সমগ্র জগতকেও রক্ষা করেছিলেন, কারণ সমগ্র বিশ্বের অস্তিত্ব শ্রীরামের অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল।

অডিয়েন্ সপ্তর্ষি রামানুজ দাস

তথ্যসূত্র – https://granthams.koyil.org/2024/12/23/sriram-leela-sundhara-kandam-hindi/ , https://granthams.koyil.org/2024/11/25/srirama-leela-sundhara-kandam-english/

প্রমেয় – https://koyil.org
প্রামাণ্য – http://srivaishnavagranthams.wordpress.com
প্রমথা – https://acharyas.koyil.org
শ্রী বৈষ্ণব শিক্ষা/বাল-বালিকা পোর্টাল – https://pillai.koyil.org

Leave a Comment